Main Menu

প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যাবস্থাপনা কমিটি ঃ অধিকার ও কর্তব্য

॥ সানজিদা ইয়াছমিন ॥
মানুষের জন্য কিছু করতে চাইলে একজন মানুষ খুঁজে পাওয়াই যথেষ্ট। যে কোন পর্যায়ের মানুষের জন্য যে কোন পর্যায়ের মানুষই কিছু করতে পারে। ছোটর জন্য বড়তো অবশ্যই কিছু করতে পারে।কিন্তু বড়র জন্য ছোটও অইেশ কিছু করতে পারে । যেমন ,সুন্দর আচরণ। একটি সুন্দর আচরণ থেকে মানুষ যা শিখে,অনেক শাসন করে ,ধরেবেধে,জেলে পুরেও তা শিক্ষা দেওয়া যায় না।মানুষ হয়তো সকল সময় ভালো কাজ করে না কিন্তু ভালো কাজ তার ভালো লাগবেই।মানুষ হয়ে জন্ম নেয়ার এটাই একটি প্রধান দায়বদ্ধতা।যে মানুষ খারাপ কাজে জড়িত নিজের অজান্তেই তার মধ্যে একটি পাপবোধ কাজ করতে থাকে।সে নিজের কাছে নিজেই ছোট থাকে, এতে তার আতœার স্বাধীনতা নষ্ট হয়,এটাই তার অবধারিত শাস্তি। যাহোক ,যে কথা বলছিলাম মানুষের জন্য কিছু করা ।কাকে দিয়ে শুরু করতে চান ? এঁটা কোন সমস্যা নয় । হাই স্কুল জীবনে একটি গল্প পড়েছিলাম। গল্পের নাম- তিনটি প্রশ্ন । এক রাজার মনে তিনটি প্রশ্নের উদয় হলো । এর উত্তর জানা গেলে সকল সমস্যার সমাধান হয় । প্রথম প্রশ্ন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ব্যাক্তি কে? দ্বিতীয় প্রশ্ন ,জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন কাজ কী? তৃতীয় প্রশ্ন,জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সময় কোনটি? অনেক খোঁজ, অনেক জিজ্ঞাসা , অনেক দ্বিধাদ্বন্দের পর একটি ঘটনাক্রমে এক সাধুর নিকট মিললো এর গ্রহণযোগ্য উত্তর । উত্তরগুলো ছিল এরকম : এক, সবেেচয়ে গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি – এখন যে তোমার কাছে আছে। দুই, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন কাজ হলো এই কাছের ব্যক্তির উপকার করা।তিন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সময় হচ্ছে এখনই।সাধু রাজাকে এর ব্যাখ্যা বুঝিয়ে দিয়ে ছিলেন।সাধুর কথা রাজার মনে ধরলো।তাইতো মানুষের জন্য কিছু করতে চাইলে ক্ষমতা থাকার কোন শর্ত নয়, উপকার প্রার্থী খুঁজে নেয়ারও কোন প্রয়োজন নেই । কিংবা সময়ের জন্য অপেক্ষা করারও দরকার পড়ে না। কিন্তু আমরাতো এই করেই সময় নষ্ট করি। এভাবে আসলে অনেক কিছুই করা হয় না। যারা স্থান কাল পাত্রের ভেদ না করে শুধুই কাজ করে চলেন তারাই জীবনে অনেক কিছু করেন। মণীষীদের জীবনী সে সাক্ষ্যই দেয়। আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা আমাদের সমাজের এক একটি ছোট অংগ ধরে যদি কাজ শুরু করি , তাহলে দেখা যাবে বৃহৎ সমাজ রাষ্ট্রেরও কাজ করা হয়ে যাচ্ছে। কারণ, একটি স্থানীয় সমাজ তো আর রাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন কোন বিষয় নয় । আমরা কে কী পদে আছি সেটা বড় কোন বিষয় নয়,বড় বিষয় হচ্ছে আমরা কে কি করছি। বড় পদে থেকে যদি আমরা হীনমন্যতার মত কাজ করি তাহলে সেটা বড় লজ্জার বিষয় । কিন্তু ছোট পদে থেকেও আমরা যদি যথাযথ কাজটি করি তাহলে সেটাই বড়, সেটাই গৌরবের । এই গৌরব ধীরে হলেও ফুলের সৌরভ ছড়ায় । এমন দৃষ্টান্তও অনেক। ছোট কাজ,বড় উপকার । আমি আজ এমনই একটি সুন্দর কাজের কথা বলতে চাই । আমাদের দেশের সকল সমাজেই একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।এখানে অনেক ছোট ছোট শিশুরা পড়া লেখা করে । তারাই আমাদের দেশের ভবিষৎ। এই বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী ভালো মানুষদের নিয়ে গঠিত হয় বিদ্যালয় ব্যাবস্থপনা কমিটি এস,এম,সি । আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ,এই কমিটিতে আসার জন্য সবাই ব্যাকুল । কিন্তু কাজ করেন ক‘জন ? এখানে ভালো কাজ করার মত লোক আমার খুব কমই চোখে পড়ে। বেশিরভাগ জানেনই না এখানে তাঁর কী কী কাজ করার আছে। যদি জানেন ,তাহলে অনেকেই তা না করার জন্য লজ্জায় পড়বেন । কিন্তু আমার উদ্দেশ্য কাউকে লজ্জা দেয়া নয়। আমি চাই ,কমিটিতে থাকা এই সমাজ গণ্য লোকগুলো সমাজের জন্য কিছু করুন। আমাদের বিদ্যালয়গুলো তার দৈন্যদশা থেকে বেরিয়ে আসুক । তাই সরকারী পরিপত্রের আলোকে গঠিত বিদ্যালয় ব্যাবস্থাপনা কমিটির (এস,এম,সি) জন্য নির্ধারিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত বিষয়াদি নিন্মে তুলে ধরা হলো(সরকারী পরিপত্র হতে সংগৃহীত )
০১। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থপনা , শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের উপর প্রতি বৎসর মে ,আষ্ট ডিসেম্বর মাসের ৩০ (ত্রিশ) তারিখের মধ্যে উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার এর নিকট নির্ধারিত ছকে কমিটির সদস্য সচিব ও সভাপতির যৌথ স্বাক্ষওে প্রতিবেদন প্রেরণ। ০২। ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক শাস্তি প্রদান পরিহার নিশ্চিতকরণ। ০৩। বিদ্যালয় ব্যবস্থপনা কমিটি বিদ্যালয় পর্যায়ে ব্যায়িত অর্থেও হিসাব অনুমোদন করবে। এসএমসি কর্তৃক খরচের বিষয়টি অনুমোদিত না হলে তা অডিট গ্রহণযোগ্য হবে না। ০৪। স্থানীয় পর্যায়ে সম্পদ সংগ্রহ ও সংরক্ষন।বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিকরণে বিদ্যালয় ব্যবস্থপনা কমিটি স্থানীয়ভাবে সম্পদ সংগ্রহ ও সদ্ব্যবহারের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। সম্পদ বলতে জনসাধারণ কর্তৃক বিদ্যালয়ের উন্নয়নে দানকৃত জমি,ভবন,আসবাবপত্র,যন্ত্রপাতি শিখন শেখানো সামগ্রী,শিক্ষা উপকরণ,নগদ অর্থ ইত্যাদি বোঝাবে। সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার প্রদত্ত শর্তসমূহ প্রযোজ্য হবে। ০৫। বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (ঝখওচ) ঃ বিদ্যালয় ব্যবস্থপনা কমিটি কর্তৃক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিল্পনা গ্রহণ করা হবে। কমিটি বিদ্যালয় ভিত্তিক উন্নয়ন পরিল্পনা বাস্তবায়নে বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নিদের্শিকা অনুসরণ করবে। এক্ষেত্রে কমিটি নি¤œরুপ দায়িত্ব পালন করবে।ক) বিদ্যালয় শিখন-শেখানো পরিবেশ সম্পর্কিত অবস্থা বিশ্লেষণ এবং সমস্যা চিহ্নিত করণ করা। খ) উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরী ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা নিশ্চিতকরণ করা। গ) বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিল্পনা কম্পর্কিত তহবিল পরিচালনা করা। ঘ) স্থানীয় জনগণের নিকট থেকে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করা।ঙ) বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন নির্দেশিকায় বর্ণিত অন্যান্য দায়িত্ব পালন করা। ৬) প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাঃপ্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি পরিচালনায় এসএমসি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ০৭) বিদ্যালয়ের নির্মান,পুননির্মান ও সম্প্রসারণ কাজের গুনগতমান নিশ্চিতকরণে এসএমসি তার দায়িত্ব পালন করবে। ৮) প্রশিক্ষনঃ ক) প্রাথমিক শিক্ষার গুনগতমান উন্নয়নে প্রশিক্ষনার্থী হিসেবে শিক্ষক নির্বাচন এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে সকল প্রকার প্রশিক্ষণে সহায়তা প্রদান করা। খ) বিদ্যালয়ের সাব-ক্লাস্টার ট্রেনিং এবং একাডেমিক তত্তাবধান ও পরিদর্শনে সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসারকে সহযোগিতা প্রদান। ৯) দূর্যোগকালীন অব্যাহত শিক্ষাঃদূর্যোগ ও আপদকালীন সময়ে ধারাবাহিক প্রাথমিক শিক্ষা লক্ষ্যে এসএমসি দায়িত্ব পালন করবে। ১০। বিদ্যালয় গমনোপযোগী সকল শিশুর বিদ্যালয় ভর্তি ও উপস্থিতি নিশ্চিত করণসহ বিদ্যালয়ত্যাগী ও বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ গ্রহণ ,ঝড়ে পড়া রোধ এবং প্রতিটি শিশুর মানসম্মত শিক্ষা প্রাপ্তি নিশ্চিত করণের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। ১১) এসএমসি কর্তৃক বিদ্যালয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষনঃ
বিদ্যালয় ব্যবস্থপনা কমিটির সদস্য -সচিব ও শিক্ষক প্রতিনিধি ব্যতীত অন্য ৯ (নয়) জন সদস্য পর্যাক্রমে বিদ্যালয় চলাকালীন সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। এক্ষেত্রে উক্ত ৯ (নয়)জন সদস্যর মধ্যে থেকে পর্যাক্রমে ৪(চার) জন সদস্য প্রতিমাসে ন্যূনতম যে কোন ৬(ছয়) দিন বিদ্যালয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষন করবেন। ১২) শিক্ষকদেও মাসিক বেদন বিলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ব্যবস্থপনা কমিটির সভাপতির প্রতিস্বাক্ষর গ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং তা কমিটির সদস্য-সচিব কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে উপজেলা /থানা শিক্ষা অফিসে প্রেরণ (সভাপতির অবর্তমানে কমিটির সহ-সভাপতি ও অপর একজন সদস্যেও প্রতিস্বাক্ষর গ্রহণপূর্বক বেতন বিল দাখিল করা যাবে। ১৩) বিদ্যালয়ের সমস্যাবলি নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণ ও উপজেলা /থানা শিক্ষা কমিটির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন ও সমন্বয় সাধন করবে। ১৪)প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য সহায়ক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা প্রদান। বিশেষ করে প্রকল্পের আওতায় সুবিধাভোগী শিশু ও পরিবার নির্বাচনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং সুবিধাভোগীর তালিকায় সভাপতি ও সদস্য -সচিবের স্বাক্ষর প্রদান। ১৫) শিক্ষক অভিভাবক সমিতির (টিটিএ) সঙ্গে সংযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধিকরণ। ১৬) বিদ্যারয় ব্যবস্থপনা কমিটির সভায় বিদ্যালয়ের সকল রেকর্ড ও রেজিস্টার পর্যালোচনা ,সংরক্ষণ ও হালনাগাদকরণ। ১৭) প্রতিমাসে বিদ্যালয় ব্যবস্থপনা কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত ছকি সভার কার্যবিবিরণী সংশ্লিষ্ট উপজেলা থানা শিক্ষা অফিসারের নিকট প্রেরণ। উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার তা মূল্যায়নপূর্বক বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ। তাছাড়া উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার কর্তৃক পরবর্তীতে ফলোআপ এবং প্রয়োজনে উপজেলা শিক্ষা কমিটিতে উপস্থাপন।১৮)কমিটির মেয়াদকাল ঃবিদ্যালয় ব্যবস্থপনা কমিটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার তারিক থেকে ৩ বৎসর পর্যন্ত বহাল থাকবে। কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাস পূর্বে পরবর্তী কমিটি নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রধান শিক্ষক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। ১৯) কমিটি বাতিলকরণসরকারি আদেশ,নির্দেশ অমান্য/উপেক্ষা ও অর্পিত দায়িত্ব কর্তব্য পালনে অবহেলা আর্থিক অনিয়ম এবং যে কোন শৃঙ্খলাপরিন্থী কার্যক্রমের জন্য যথারীতি কারণ দর্শানো নোটিশ জারিপূর্বক সংশ্লিষ্ট উপজেলা /মহানগরী প্রাথমিক শিক্ষা কমিটি উপযুক্ত ক্ষেত্রে বিদ্যালয় ব্যবস্থপনা কমিটি বাতিলকরণের সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক অনিয়মের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সেক্ষেত্রে উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার তারিখ নির্ধারণপূর্বক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি পুনগঠনের প্রক্রিয়া শুরু করবেন।
লেখক ঃ উপজেলা নির্বাহী অফিসার,নড়িয়া,শরীয়তপুর।

Facebook Comments





error: Content is protected !!